রূপক গল্প

লালবাগের শুধু এক দরজা

পরী বিবির সমাধির গোপন সুড়ঙ্গ

লালবাগ কেল্লার যে গোপন সুড়ঙ্গটি ব্রিটিশ আমলে চিরতরে প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তার ভেতর থেকে আজও সুর ভেসে আসে।

লালবাগ কেল্লার পরীবিবির সমাধির ঠিক দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি ছোট অন্ধকার তোরণ রয়েছে, যার প্রাচীন কাঠের ভারী দরজাটি দীর্ঘ তিনশত বছর ধরে লোহার শিকল ও মোমের সিলে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় মানুষের মুখে প্রচলিত বহু মিথ রয়েছে যে, এই দরজার ওপাশে রয়েছে এক সুবিশাল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ — যা বুড়িগঙ্গার তলদেশ পেরিয়ে সোজা জিনজিরা প্রাসাদে গিয়ে পৌঁছেছে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গবেষক ফারহান আজমী বিশেষ সরকারি অনুমতি নিয়ে সেই সুড়ঙ্গের প্রাথমিক স্ক্যানিং পরিচালনা করছিলেন। আধুনিক গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার স্ক্যানারে ধরা পড়ল এক অভাবনীয় চিত্র — দরজার ঠিক বিশ ফুট নিচে কোনো ফাঁকা সুড়ঙ্গ নেই; সেখানে রয়েছে একটি বিশাল পাথরের অষ্টভুজ সুরম্য দরবার কক্ষ, যার দেয়ালগুলোতে এখনও জমে আছে প্রাচীন পারস্যের রঙিন মিনারেলের আস্তর।

মুঘল ইতিহাসের প্রবেশদ্বার

ফারহান যখন দরজার একটি ছোট কাঠের ফাটল দিয়ে তার ফাইবার-অপটিক মাইক্রো-ক্যামেরা ভেতরে প্রবেশ করালেন, তখন ডিসপ্লেতে ভেসে উঠল সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলের ব্যক্তিগত খাসমহলের ছবি। পাথরের কুলুঙ্গিতে রাখা ছিল অক্ষত পিতলের চেরাগ, প্রাচীন মৃৎপাত্র এবং রাজকীয় সিলমোহরযুক্ত কিছু পাণ্ডুলিপির বাক্স।

দরজাটি খোলার জন্য কোনো ভারী বুলডোজার দরকার নেই; দরকার কেবল ঐতিহাসিক সত্যকে উপলব্ধি করার সংবেদনশীলতা। ফারহান সিদ্ধান্ত নিলেন, এই দরজা জোর করে খোলা হবে না। এটি থাকবে একটি জীবন্ত স্মৃতি তোরণ হিসেবে, যা পরবর্তী প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে মুঘল ঢাকার সমৃদ্ধ স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের অপার মহিমা।

লালবাগ কেল্লার সেই সুবিশাল দক্ষিণের দরজার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় যেন ইতিহাসের সমস্ত সুর ও কান্না এখানেই এসে সমবেত হয়েছে। শাহ সুজা ও পরীবিবির অমর প্রেমের স্মৃতিবিজড়িত এই অসমাপ্ত কেল্লা আজও ঢাকার বুকে এক অপার বিস্ময়। গবেষক শিরীন আখতার বহু বছর ধরে এই কেল্লার স্থাপত্যশৈলী নিয়ে গবেষণা করছেন।

কেল্লার সেই বিখ্যাত সুরঙ্গপথটি নিয়ে মানুষের মুখে মুখে কত শত গল্প প্রচলিত আছে — কত ব্রিটিশ সৈন্য সেই সুড়ঙ্গে নেমে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি, কত ধনরত্ন আজও চাপা পড়ে আছে মাটির নিচের প্রকোষ্ঠে। কিন্তু শিরীন আপা জানেন, আসল সম্পদ কোনো সোনাদানা নয়; আসল সম্পদ হলো বাংলার সেই মধ্যযুগীয় শিল্পীদের অতুলনীয় স্থাপত্যকৌশল যা শত শত বছর পরেও ভূমিকম্প ও বন্যার মাঝে অটুট দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বিকেলের সূর্য যখন