Rupok Stories

সুলতানের চিঠি

একটি ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপির অনুসন্ধান

আর্কাইভের তিন নম্বর বাক্সে যে চিঠিটা ছিল, কোনো অফিশিয়াল ক্যাটালগে তার নাম নেই।

সোনারগাঁয়ের প্রাচীন গোয়ালদি মসজিদের মেহরাবের সংস্কারের সময় যখন পেছনের ইট সরানো হলো, তখন ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি পোড়ামাটির সিলমোহরকৃত নলাকার পাত্র। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সাবধানে ঢাকনা খুলতেই আবিষ্কৃত হলো ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের স্বহস্তে লেখা এক ঐতিহাসিক ফারসি ফরমান — যাকে ঐতিহাসিকরা বলছেন 'বাংলার প্রথম ঐক্য সনদ'।

চিঠিখানি লেখা হয়েছিল তৎকালীন গৌড়ের এক বিশ্বস্ত সুফি দরবেশের উদ্দেশ্যে। সেই ফরমানের প্রতিটি অক্ষরে ফুটে উঠেছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, সার্বভৌম বাংলার স্বপ্ন। দিল্লি সালতানাতের অধীনতা ছিন্ন করে তিনি লিখেছিলেন: 'গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী এই জলভূমি কোনো সম্রাটের করতলগত হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি। এই দেশের জলবায়ু, তার ধানের সৌরভ এবং তার মানুষের প্রাণশক্তি এক স্বতন্ত্র সত্তা দাবি করে।'

সোনারগাঁয়ের রাজকীয় মোহর

ফরমানের নিচের অংশে ছিল ইলিয়াস শাহের ব্যক্তিগত রক্তলাল রেশমি মোমের মোহর। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, সোনারগাঁয়ের সমস্ত তাঁতি, কৃষক ও মাঝিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারে।

চিঠিটি পাঠ করতে গিয়ে গবেষকদের চোখ সজল হয়ে উঠল। প্রায় সাতশত বছর আগে রচিত এই নথিতে যে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রজার প্রতি ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়, তা আধুনিক রাষ্ট্রনায়কদের জন্যও এক বিরল অনুকরণীয় আদর্শ। সোনারগাঁয়ের বাতাস যেন সেই প্রাচীন সুলতানের অমর আত্মমর্যাদার বাণী আজও ফিসফিস করে শুনিয়ে যায়।

সুলতানি আমলের সেই রেশমি কাগজের চিঠিটির প্রতিটি হরফে আজও যেন মিশে আছে সোনারগাঁয়ের রাজদরবারের গৌরবোজ্জ্বল সুবাস। তৎকালীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ পারস্যের অমর কবি হাফিজকে বাংলায় আমন্ত্রণ জানিয়ে এই ঐতিহাসিক পত্র লিখেছিলেন। চিঠির মার্জিনে সূক্ষ্ম স্বর্ণচূর্ণের নকশা প্রমাণ করছিল মধ্যযুগীয় বাংলার লিপিকলা ও শিল্পকলার চরম পরাকাষ্ঠা।

গবেষক যখন পাণ্ডুলিপিটির ভাঁজ খুলছিলেন, তখন তার মনে হচ্ছিল তিনি সরাসরি দাঁড়িয়ে আছেন সেই সুবিশাল দরবার কক্ষে — যেখানে দেশ-বিদেশের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, কবি ও চিত্রশিল্পীরা সমবেত হয়ে মানবতার শাশ্বত বাণী রচনা করতেন। কবি হাফিজ বাংলায় আসতে না পারলেও তিনি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গজল উপহার পাঠিয়েছিলেন সুলতা