বাঁশের কেল্লার পাহারা
এক রাতের গল্প
কেল্লা ভেঙে গেছে বহু আগে, কিন্তু পাহারাদার আজও রাতের কুয়াশায় নিঃশব্দে হেঁটে যায়।
১৮৩১ সালের কুয়াশাভেজা হেমন্তের সকালে নারকেলবাড়িয়ার দিগন্তজোড়া ধানখেতের ওপর তখন কেবল প্রথম সূর্যের আলো ছুঁয়েছে। বাঁশের তৈরি সুদৃঢ় কেল্লার তোরণে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন তরুণ লাঠিয়াল গোলাম মাসুম। তার হাতে তেলচকচকে সাতহাত লম্বা পাকা বাঁশের লাঠি, আর চোখে এক অপরাজেয় মুক্তিকামী কৃষকের তেজ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোরা পল্টন এবং স্থানীয় অত্যাচারী জমিদারদের সম্মিলিত বাহিনী তখন মাত্র তিন ক্রোশ দূরে নিজেদের কামান সাজাচ্ছে।
তিতুমীর ফজরের নামাজ শেষ করে কেল্লার প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালেন। তার শুভ্র দাড়িতে বাতাসের দোলা, কিন্তু মুখে কোনো ভয়ের লেশমাত্র ছিল না। তিনি উপস্থিত সহস্রাধিক কৃষকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ভাইসব, এই মাটি আমাদের, এই ধানের শিষ আমাদের ঘামে তৈরি। ইংরেজ বেনিয়ারা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অন্যায় কর, আর জমিদাররা কেড়ে নিচ্ছে আমাদের মুখের গ্রাস। আমরা যদি আজ এই বাঁশের কেল্লায় দাঁড়িয়ে প্রাণ বিসর্জন দিই, তবে সেই রক্ত থেকে আগামী শতাব্দীতে বাংলার মুক্তির মহীরুহ জন্ম নেবে।'
কামানের সামনে লাঠি
দুপুর গড়াতেই শুরু হলো ইংরেজ বাহিনীর কামানের গোলাবর্ষণ। মেজর স্কটের নির্দেশে একের পর এক কামানের গোলা এসে আছড়ে পড়তে লাগল বাঁশের মজবুত দেয়ালের ওপর। বাঁশ ভাঙছিল, ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠল নারকেলবাড়িয়ার আকাশ, কিন্তু সেই কেল্লার ভেতর থেকে কৃষকদের 'আল্লাহু আকবার' আর স্বাধীনতার ধ্বনি কিছুতেই স্তব্ধ করা গেল না। লাঠিয়ালরা বুক চিতিয়ে কামানের গোলার সামনে দাঁড়িয়ে রইল নিজেদের মাটির অধিকার রক্ষার জন্য।
গোলাম মাসুম আহত অবস্থাতেও শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত কেল্লার পতাকা বুকে চেপে রেখেছিলেন। ইংরেজরা বাঁশের কেল্লা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা পরাজিত করতে পারেনি কৃষকদের অদম্য আত্মমর্যাদাবোধকে। সূর্যাস্তের রক্তিম আভায় নারকেলবাড়িয়ার সেই বাঁশের কেল্লা চিরদিনের জন্য বাংলার গণসংগ্রামের এক অমর প্রতীক হয়ে ইতিহাসে স্থান করে নিল।
নারকেলবেড়িয়ার বাঁশের কেল্লার প্রতিটি বাঁশের খুঁটিতে মিশে ছিল তিতুমীরের কৃষকদের রক্ত ও আত্মত্যাগের অমর স্মৃতি। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কামান যখন সেই মাটির কেল্লার ওপর গোলাবর্ষণ করছিল, তখন কেল্লার ভেতর কোনো হতাশা বা কান্নার রোল ছিল না; ছিল চরম দেশপ্রেম আর স্বাধীনতা রক্ষার এক অটল সংকল্প। গোলাম মাসুম কেল্লার প্রাচীরে দাঁড়িয়ে দূরবীনে