Rupok Stories

শতাব্দীর শেষ খেয়া

নদীমাতৃক বাংলার এক বিষণ্ণ মহাকাব্য

যমুনা নদীর ভাঙনে যখন পুরো গ্রাম বিলীন হতে লাগল, তখন বৃদ্ধ হাশেম মাঝির শেষ খেয়ানৌকা বাঁচিয়ে দিল শত প্রাণের ভবিষ্যৎ।

পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের ওপর তখন সন্ধ্যার রক্তিম আভা নেমে এসেছে। গোয়ালন্দ ঘাটের প্রবীণ খেয়ামাঝি রহমত উল্লাহ তার বিশাল কাঠের গয়না নৌকার হাল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আজ তার জীবনের শেষ খেয়া পারাপার। গত পঞ্চাশ বছর ধরে এই নদীর বুকে তিনি লাখো মানুষকে এক তীর থেকে অন্য তীরে পৌঁছে দিয়েছেন — বিয়েবাড়ির বরযাত্রী থেকে শুরু করে একাত্তরের শরণার্থী, সবাইকে তিনি নিরাপদে বুকে টেনে নিয়েছেন।

নৌকার পাটাতনে বসে ছিল বিভিন্ন বয়সের যাত্রী। একপাশে এক বৃদ্ধ কৃষক তার নতুন নাতির মুখ দেখানোর জন্য ওপারে নিয়ে যাচ্ছেন, অন্যপাশে এক তরুণ কবি খাতায় নদী নিয়ে কবিতা লিখছেন। রহমতের মনে পড়ছিল সেই প্রলয়ঙ্করী বন্যার দিনগুলোর কথা, যখন নিজের ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ার পরেও তিনি দিনরাত এক করে বিপন্ন মানুষদের উদ্ধার করেছিলেন।

পদ্মার শেষ যাত্রী

মাঝনদীতে পৌঁছাতেই হঠাৎ বাতাস থেমে গেল। নদীর জল যেন এক শান্ত রূপালি আয়নায় পরিণত হলো। দূরে আজানের মধুর সুর ভেসে এল চরের দিক থেকে। রহমত উল্লাহ তার গলার গামছাটা আলতো করে খুলে মাথায় বাঁধলেন। তিনি বুঝলেন, নদী শুধু পারাপারের পথ নয়; নদী হলো মানুষের জীবনের রূপক — জন্ম থেকে মৃত্যুর ঘাটে এক অবিরাম যাত্রা।

ওপারে যখন নৌকা এসে ঘাটে ঠেকল, তখন প্রতিটি যাত্রী একে একে নেমে গিয়ে রহমতের হাত ধরে দোয়া করল। রহমত একা গলুইয়ে বসে রইলেন। পদ্মার জোয়ারের জল এসে আলতো করে ছুঁয়ে যেতে লাগল তার নৌকার পুরোনো কাঠকে — যেন বহু বছরের পরম বন্ধুকে নদী তার বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছে।

পদ্মার সেই প্রাচীন খেয়াঘাটে যখন শেষ বিকেলের রোদ এসে পড়ত, তখন মনে হতো যেন নদী নিজেই এক রূপালী ফিতা হয়ে বয়ে চলেছে অসীম অনন্তের দিকে। পঞ্চাশ বছর ধরে এই ঘাটে নৌকা বাইছেন মদন মাঝি। কত বরযাত্রী, কত স্বদেশী বিপ্লবী, কত ছিন্নমূল পরিবারের মানুষ তার এই কাঠের নৌকায় চড়ে পারাপার হয়েছে — তার কোনো হিসাব নদীর বালিতে লেখা নেই।

একাত্তরের সেই ভয়াল রাতে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে শত শত মুক্তিযোদ্ধা আর সাধারণ গ্রামবাসীকে পৌঁছে দিয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ে। নদীর বুকে তখন পাকিস্তানি গানবোটের সার্চলাইটের আলো ঘুরছিল, কিন্তু মদন মাঝির অভিজ্ঞ হাত অন্ধকারেও নদীর গোপন ঘূর্ণিস্রোত এড়িয়ে ঠিকই নৌকাকে পৌঁছে দিয়েছিল ওপারে।

আজ যখন তিনি ঘাটের পাড়ে বসে হুঁকোয় টান দেন, তখন নতুন যুগের আধুনিক মোটরলঞ্চগুলো দ্রুতগতিতে জল কেটে চলে যায়। কিন্তু মদন মাঝ