রক্তকরবীর ছায়া
উত্তরবঙ্গের রাজবাড়ির গোপন অধ্যায়
নাটোরের ধ্বংসোন্মুখ জমিদার বাড়ির বাগানে যে লাল করবী গাছটি শত বছর ধরে ফুল ফোটাচ্ছে, তার শিকড়ে ঘুমিয়ে আছে এক অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরের প্রাচীন জমিদার বাড়ির বিশাল সিংহতোরণের সামনে প্রতি বছর শ্রাবণে ফুটে ওঠে শত শত তাজা রক্তকরবী ফুল। তাদের রক্তিম রঙে পুরো চত্বর যেন এক রক্তাক্ত শোকের চাদরে ঢেকে যায়। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, এই রক্তকরবী গাছগুলোর নিচে লুকিয়ে আছে জমিদারি আমলের এক করুণ বিদ্রোহ আর এক কিশোরী বধূর আত্মত্যাগের ইতিহাস।
প্রতাপশালী জমিদার নীলকণ্ঠ রায় যখন নিরীহ প্রজাদের ওপর চড়া খাজনা চাপিয়ে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে শুরু করেন, তখন তার একমাত্র ছোট মেয়ে নন্দিনী এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। নন্দিনী তার বাবার নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদে রাজকীয় পোশাক ত্যাগ করে সাধারণ কৃষকদের সাথে রক্তকরবীর মালা গেঁথে অবস্থান নিয়েছিল কেল্লার সদর দরজায়।
রক্তের দামে স্বাধীনতা
এক রাতে জমিদারের লেলিয়ে দেওয়া লাঠিয়ালরা যখন প্রজাদের ডেরায় আগুন ধরিয়ে দিল, তখন নন্দিনী নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে বহু নিরপরাধ শিশুকে আগুনের শিখা থেকে বাঁচিয়ে এনেছিল। সেই আগুনের ধোঁয়ায় তার শেষ নিশ্বাস মিশে গিয়েছিল এই মাটির সাথে।
পরের বছর থেকেই সেই সিংহতোরণের চারপাশে গজিয়ে উঠল এই বিশালাকার রক্তকরবীর বন। শতাব্দী পেরিয়ে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু সেই রক্তকরবীর লাল ফুলগুলো আজও প্রতি শ্রাবণে ফুটে ওঠে মানুষকে মনে করিয়ে দিতে যে — ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগের মহিমা কোনোদিন ম্লান হতে পারে না।
নাটোরের সেই শতাব্দীপ্রাচীন জমিদার বাড়ির সিংহদরজার সামনে রক্তকরবী গাছটিতে যখন থোকা থোকা লাল ফুল ফোটে, তখন মনে হয় যেন অতীত নিজেই রক্তাক্ত হৃদয়ে ফিরে এসেছে নিজের কথা বলতে। রবীন্দ্রনাথের সেই অমর নাটকের মতো এখানেও একসময় ক্ষমতা, স্বর্ণ আর মানবিক ভালোবাসার মাঝে এক চরম দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়েছিল।
অমিত যখন সেই ভাঙা নাটমন্দিরের পাথুরে সিঁড়িতে বসে ডায়েরিতে লিখছিল, তখন বাতাসে ভেসে আসছিল শুকনো পাতার দীর্ঘশ্বাস। এখানকার শেষ জমিদার কন্যা নন্দিনীর মতো মুক্ত প্রাণের প্রতীক ছিলেন; তিনি রাজকীয় ঐশ্বর্যের মোহ ত্যাগ করে সাধারণ কৃষকদের মুক্তির গান গেয়েছিলেন।
বিকেলের স্নিগ্ধ রোদে রক্তকরবীর লাল পাপড়িগুলো খসে পড়ছিল প্রাচীন মার্বেলের মেঝের ওপর। অমিত অনুভব করল, শিল্প আর সাহিত্যের সৃষ্টি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; তা আমাদের ভৌগোলিক পরিবেশে, প্রাচীন ইটের ঘ্রাণে আর মানুষের সংগ্রামী ঐতিহ্যে চিরকাল জীবন্ত হয়ে নিঃশ্বাস নেয়।
চরে