Rupok Stories

অদৃশ্য স্টেশন

টঙ্গী জংশনের একটি রাতের অভিজ্ঞতা

ট্রেনের সিগন্যাল যখন কুয়াশার ভেতর মুছে যায়, তখন ট্রেনের শেষ কামরাটি থামে এমন এক স্টেশনে যার নাম কোনো টাইমটেবিলে নেই।

মধুপুর বনের গভীর শালবনের ভেতরে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত একটি পরিত্যক্ত রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যার নাম কোনো আধুনিক ট্রেনের সময়সূচিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্থানীয় গাড়ো আদিবাসীরা এই স্থানটিকে বলে 'অদৃশ্য স্টেশন'। তাদের বিশ্বাস, প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাতে যখন কুয়াশায় বনের সমস্ত পথ হারিয়ে যায়, তখন এই স্টেশনে একটি শতাব্দীপ্রাচীন বাষ্পচালিত ভূতুড়ে ট্রেন এসে কয়েক মিনিটের জন্য দাঁড়ায়।

রেলওয়ে ইতিহাস গবেষক শুভেন্দু মিত্র সেই রহস্য উন্মোচন করতে এক অমাবস্যার রাতে প্ল্যাটফর্মের ভাঙা বিশ্রামাগারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার সাথে ছিল একটি প্রাচীন পিতলের লণ্ঠন এবং টেপ রেকর্ডার। রাত ঠিক দুটো বেজে তেরো মিনিটে বনের ভেতরের তাপমাত্রা হঠাৎ শূন্যের কোঠায় নেমে এল। দূরে শোনা গেল এক ভারী লোহার চাকার একটানা ঝমাঝম শব্দ এবং একটি প্রলম্বিত বাষ্পীয় হুইসেল।

কুয়াশার ট্রেন

কুয়াশা ভেদ করে প্ল্যাটফর্মে এসে থামল কালো রঙের একটি ভিক্টোরিয়ান যুগের স্টিম ইঞ্জিন ট্রেন। ট্রেনের জানালার কাঁচগুলো ছিল অস্বচ্ছ বরফের মতো, যার ওপাশে অস্পষ্ট ছায়ার মতো যাত্রীরা বসে ছিলেন। ট্রেনের গার্ডের পোশাক পরা এক অপার্থিব অবয়ব সবুজ লণ্ঠন নাড়িয়ে শুভেন্দুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

শুভেন্দু টেপ রেকর্ডার অন করতেই তাতে ধরা পড়ল এক শতাব্দী পূর্বের যাত্রীদের কোলাহল, ট্রেনের কয়লার ইঞ্জিনের গর্জন এবং এক করুণ বিদায়ের সুর। ট্রেনটি মাত্র দুই মিনিট অবস্থান করে নিঃশব্দে গভীর শালবনের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। শুভেন্দু বুঝতে পারলেন, সময়ের এমন কিছু গোপন স্টেশন থাকে যেখানে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস অনন্তকালের জন্য যাত্রা অব্যাহত রাখে।

ভাওয়াল পরগনার সেই পরিত্যক্ত রেলওয়ে স্টেশনটিতে বহু বছর ধরে কোনো যাত্রীবাহী ট্রেন থামে না। লাল ইটের ওয়েটিং রুমের ওপর গজিয়ে উঠেছে বুনো অশ্বত্থ আর লতানো শ্যাওলা। কিন্তু বর্ষার রাতে যখন গভীর কুয়াশায় লাইনগুলো ভিজে ওঠে, তখন স্থানীয় স্টেশনমাস্টার আজও এক অদ্ভুত হুইসেলের শব্দ শুনতে পান দূর দিগন্ত থেকে।

ব্রিটিশ আমলের সেই সিগন্যাল বাতিটি আজও মাঝে মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সবুজ রঙে জ্বলে ওঠে। বৃদ্ধ আব্দুল লতিফ লণ্ঠন হাতে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ান। তিনি জানেন, এই প্ল্যাটফর্মে কোনো রক্তমাংসের ট্রেন থামে না; থামে শত বছরের ইতিহাস আর স্মৃতি — যে স্মৃতিগুলো সময়ের রেললাইন ধরে অনন্তকালের দিকে ছুটে চলেছে।